ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

“সাগর কন্যার টানে…, কুয়াকাটার পানে…”

কুয়াকাটা, কালাপাড়া, লতাচাপলি, পটুয়াখালী, বরিশাল, বাংলাদেশ।

“সাগর কন্যা কুয়াকাটা, অঙ্গে তোমার রূপের ছটা…, সাগর কন্যা কুয়াকাটা, তুমি যে আমার স্বপ্নের রাজকন্যা…।

তাই তো…..

রাজকন্যা তোমার প্রেমে আমি, দিলাম নিজেকে উজাড় করি…, ও আমার প্রেমের লাইলি, তোমায় যে আমি ভালোবাসি…..।

এবারের লেখাটা ছন্দ আকারেই শুরু করলাম। তার একটা কারণও আছে। এই নিয়ে আমার কুয়াকাটা যাওয়া হলো দুইবার। প্রথমবার গিয়েছিলাম ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে করোনা মহামারীর প্রভাব অনেকটা কমে যাওয়ার পর। অক্টোবর মাসের ১২ তারিখ রাতে আব্দুল্লাহপুর থেকে রওনা দিয়ে ১৩ তারিখ সকালে কুয়াকাটা গিয়ে পৌঁছাই। এবার আসলে যাওয়ার খুব বেশি ইচ্ছে ছিল না। কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছিল ঐ সময়ের আবহাওয়াটা কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তবে আমার ধারণা করাটা সম্পূর্ণভাবে না মিলে গেলেও আকাশ মেঘলা থাকার কারণে কুয়াকাটার সকালের সূর্যোদয়টা প্রত্যাশিতভাবে দেখার সুযোগ হলোনা। তারপরও প্রকৃতি আমাকে নিরাশ করেনি। শুধুমাত্র সূর্যোদয় ব্যতীত কুয়াকাটার সৌন্দর্য করেছে আমাকে মুগ্ধ। প্রকৃতি যেন তার সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে।

সাগরকন্যা হিসেবে পরিচিত কুয়াকাটা বাংলাদেশের দক্ষিণ – পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম একটি নৈসর্গিক সমুদ্র সৈকত, যেটি ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ভ্রমণ কেন্দ্র। কুয়াকাটা বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার অন্তর্গত কালাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে অবস্থিত। উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী কুয়াকাটা একটি “গ” শ্রেণির পৌরসভা। এটি একটি নগরভিত্তিক স্থানীয় সরকার সংস্থা যার প্রশাসনিক কার্যক্রম মহিপুর থানার আওতাধীন। কুয়াকাটা পৌরসভাটি ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পটুয়াখালী জেলার অন্তর্গত কালাপাড়া উপজেলার লতাচাপলি, গঙ্গামতি, কাউয়ার চর ও চর চাপলি মৌজা নিয়ে একটি “গ” শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কুয়াকাটা পৌরসভার বর্তমান আয়োতন ৮.১১ বর্গ কিলোমিটার। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী কুয়াকাটার মোট জনসংখ্যা ৯০৭৭ জন ও পরিবার সংখ্যা ২০৬৫ টি এবং পৌরসভাটির স্বাক্ষরতার হার ৫১%।

বঙ্গোপসাগরের তটে অবস্থিত অনিন্দ্য সুন্দর ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটির পূর্ব দিকে রয়েছে কুয়াকাটার অন্যতম একটি পর্যটন আকর্ষণ লাল কাঁকড়ার দ্বীপ। লাল কাঁকড়ার দ্বীপ থেকে পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরের ভরা জলরাশি পার হলেই রয়েছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে উপজেলার সমুদ্র উপকূলবর্তী সীমান্ত এলাকা। লাল কাঁকড়ার দ্বীপ থেকে কিছুটা উত্তরে গেলেই রয়েছে ধুলাস্বর সমুদ্র সৈকত ও গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকতের মত দর্শনীয় স্থান। এছাড়াও গঙ্গামতি ও ধুলাস্বর সমুদ্র সৈকত থেকে পূর্ব দিকে গেলেই রয়েছে চর কাশেম, আন্দার চর, চর মন্তাজ, চর কুকরি মুকরি সহ ছোট বড় অনেকগুলো চর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটির একেবারে পশ্চিম দিকে রয়েছে খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার স্মরণখোলা উপজেলার অন্তর্গত সুন্দরবনের দুবলার চর সহ সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন অঞ্চলের ছোট – বড় আরো কিছু চর ও দ্বীপ। কৃত্রিমতার ছাপহীন সাগর আর বনে অনন্য কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেকগুলো উপভোগ্য ভ্রমণ স্থান। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে পশ্চিম দিকে পশ্চিম বেরি বাঁধ রোড দিয়ে ৫ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই পড়বে লেবুর বন। একই রাস্তা দিয়ে বা সমুদ্র সৈকতের পাশ দিয়ে তীর ঘেঁষে এগিয়ে গেলে পর্যায়ক্রমে দেখা মিলবে ইভালোনা বীচ, ঝাউবন, তিন নদীর মোহনা, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও ফাতরার চর যেগুলোর সৌন্দর্য পর্যটকদের করবে বিমোহিত। নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের উত্তর দিকে রয়েছে পটুয়াখালী জেলার কালাপাড়া উপজেলা ছাড়াও বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলাসমূহ এবং সৈকতের দক্ষিণ দিকে রয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত ভরা জলরাশির বঙ্গোপসাগর।

মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিসমূহের এক অপরূপ নিদর্শন হলো কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উভয় মূহুর্তই নয়ন ভরে অবলোকন করা যায়। একই স্থানে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের বুকে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সমারোহ ভেদ করে পূর্ব আকাশে অগ্নিকুণ্ডের রঙ ধারণ করে ধীরে ধীরে সূর্য উদয় হওয়ার দৃশ্য এবং সোনালি রঙ ধারণ করে পশ্চিম আকাশ থেকে আবার সেই ঢেউয়ের সাথে সমুদ্রের বুকে মিলিয়ে যাওয়ার সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যে কারো জন্যই নিঃসন্দেহে পরম সৌভাগ্যের। ভালোভাবে সূর্যোদয় দেখার জন্য অন্যরা গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকতকে সাজেস্ট করলেও আমার মতে লাল কাঁকড়ার দ্বীপই হচ্ছে সূর্যোদয় দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান এবং ভালোভাবে সূর্যাস্ত দেখতে হলে যেতে হবে লেবুর বন অথবা ঝাউবন।

অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক মিলনমেলা যেন বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার এই কুয়াকাটা। আমার লেখনীতে উল্লেখ্য ভ্রমণ স্থানগুলো ছাড়াও কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আশেপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরো কিছু দর্শনীয় স্থান – সীমা বৌদ্ধ বিহার, রাখাইন আদিবাসীদের পল্লী কেরানিপাড়া, আলীপুর বন্দর, মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার, শুটকি পাড়া, রাখাইন মহিলা মার্কেট, কুয়াকাটার প্রাচীন কুয়া ইত্যাদি। ধারণা করা হয় কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের খুব সন্নিকটে উত্তর দিকের কেরানিপাড়া এলাকার দক্ষিণাংশে বড় আকারের এই প্রাচীন কুয়া থেকেই কুয়াকাটা নামের উদ্ভব হয়েছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে ১৮ শতকের দিকে আরাকানরা মুঘল শাসকদের দ্বারা বার্মা থেকে বিতারিত হয়ে এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে। তখন তারা সুপেয় পানির অভাব পূরণ করতে প্রচুর কুয়া বা কূপ খনন করেছিলেন। আর সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় কুয়াকাটা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button