অনুপ্রেরণামূলক সত্য ঘটনা

“অহংকার তুমি বাংলাদেশের”

প্রথমেই শুকরিয়া আদায় করছি সৃষ্টিকর্তার প্রতি, যার করুণায় এখনো সুস্থতার সহিত বেঁচে আছি। শ্রদ্ধাভরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি, যার বলিষ্ঠ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ “কোভিড – ১৯” এর মতো মারাত্মক ও ভয়াবহ সংকট সফলভাবে মোকাবেলা করে যাচ্ছে। বাংলা ভাষায় খুবই বহুল প্রচলিত দুইটি প্রবাদ আছে : একটি হলো ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’, অপরটি হলো ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। এই প্রবাদ দুইটির ভাবার্থ ও সারমর্ম আমাদের সবারই জানা থাকার কথা। প্রবাদ দুটিতে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে কোন কাজ করার বিষয়টিকে বুঝানো হয়েছে। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পেয়েছি সারা বাংলাদেশ ব্যাপী বৈশ্বিক মহামারি “কোভিড – ১৯” সংকট এর বিরুদ্ধে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে। সারা বিশ্ব যেখানে “কোভিড – ১৯” এর কবলে পড়ে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি অতিবাহিত করছিল, বিশ্বের বড়বড় উন্নত দেশসমূহ “কেভিড – ১৯” মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছিল সেখানে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ “কোভিড-১৯” মোকাবেলা করেছে ব্যাপক দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ও আহ্বানে বাংলাদেশের যুব সমাজ “কোভিড-১৯” মোকাবেলায় জীবন বাজি রেখে অদম্য সাহসিকতা প্রদর্শন করে সেচ্ছাসেবী হিসেবে বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রমে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে।

করোনা মহামারিতে সারা বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান থেকে সাধ্য অনুযায়ী অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী কর্মী ও সেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের সেচ্ছাসেবী কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সকল সেচ্ছাসেবী কর্মীই তারা তাদের নিজের জায়গায় একেকজন বীর যোদ্ধার ন্যায়। কেউ কাজ করেছেন সংক্রমিতদের মধ্যে থেকে ভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা করার মাধ্যমে, কেউ কাজ করেছেন অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে, কেউ কাজ করেছেন খাদ্য সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আবার কেউ কাজ করেছেন উল্লেখিত কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য সময় ও শ্রম দিয়ে। সুতরাং কারো অবদানই কোনো অংশে কম নয়। সবাই নিজের জয়াগাতে একেকজন সাহসী করোনা যোদ্ধা। তাই আমি সকল সেচ্ছাসেবী কর্মী ও সংগঠনের প্রতি এবং তাদের কাজের প্রতি সর্বোচ্চ সমান প্রদর্শন করে আমার জানা অনুপ্রেরণামূলক ঘটনাটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে একটি হাসপাতালে প্রথম বারের মতো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হওয়ার পর ৩১ ডিসেম্বর এই ভাইরাস সংক্রমণের খবর প্রকাশিত হয়। খুব দ্রুত এই ভাইরাসটির প্রভাব সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভাইরাসটি যে এত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পরবে সেটা মানুষের কল্পনাতীত ছিল। পৃথিবী ব্যাপী সৃষ্টি হয় এক সংকটাপন্ন অবস্থা। ২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট এই রোগটিকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং “২০১৯ – এনসিওডি” নামে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাইরাসটির নামকরণ করে। ঠিক এই ঘোষণার কয়েকদিন আগেই ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পুরো বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসের ছোবলে স্মরণকালের সংকটাপন্ন অবস্থায় নিমজ্জিত, সময়ের আবর্তনে বাংলাদেশেও তার ব্যাপক বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়। আর এই অবস্থা মোকাবেলা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের ন্যায় পুরো জাতি একসাথে যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি কাজ শুরু করে। আর এই মানবকল্যাণকর কাজে গাজীপুর বাসির অংশগ্রহণ ছিল নজিরবিহীন।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সব জেলা গুলোর মধ্যে গাজীপুর ছিল অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি জেলা। এই পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত টঙ্গী থানার বিভিন্ন এলাকায় জনাব মোহাম্মদ আক্তার সরকারের নেতৃত্বে আব্দুল্লাহ আল নোমান সহ বেশ কয়েকজন সাহসী যুবক তাদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন মানবকল্যাণকর ও সামাজিক কাজে ঝাপিয়ে পড়ে। এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই স্থাপিত হয় অতি অপ্রত্যাশিত নজিরবিহীন এক দৃষ্টান্ত। ২০২০ সালের ২ এপ্রিল সকাল ৮.৩০ এর দিকে হঠাৎ করে জনাব মোহাম্মদ আক্তার সরকার এর পিতা তাকে তার ছোট ভাইকে দিয়ে ডেকে তার হাতে “এক লক্ষ টাকা” তুলে দেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই টাকা তিনি নিজের জন্য বা ছেলের জন্য বা নিজের পরিবারের খরচের জন্য দেন নি। এই অর্থ তিনি ছেলে মোহাম্মদ আক্তার সরকারকে প্রদান করেছেন করোনাকলীন সংকট মোকাবেলায় খাদ্য অভাবে নিমজ্জিতদের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য। আশি বছর বয়স্ক ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্ত্রীর উপস্থিতিতে ছেলের হাতে যে অর্থ তুলে দেন দিয়েছিলেন তা ছিল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত দশ মাসের মুক্তিযোদ্ধা ভাতার জমানো অর্থ। এতক্ষণে হয়তো আপনারা এই নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মহান মুক্তিযোদ্ধার নাম জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন৷ জী নামতো প্রকাশ করতেই হবে, তবে তার আগে উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে বাবা ও ছেলের ছেলের মধ্যে সংগঠিত হওয়া কথোপকথন আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। তাই এই নজিরবিহীন ঘটনা নিয়ে আমি আর বেশি কিছু না লিখে ছেলে মোহাম্মদ আক্তার সরকার এর সরাসরি সাক্ষাৎকারের আলোকে ও তার ফেসবুকের টাইমলাইন থেকে পাওয়া লেখনী অনুযায়ী পিতা ও পুত্রের কথোপকথনটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

পিতা ও পুত্রের কথোপকথোন – “আজকে আমার বাবা আমাকে ডাক দিয়ে বলে – টাকা আছে? আমি বলি আছে, কেন? এই যে দুইদিন আগে তুই এরশাদ নগরে চাল ডাল দিছছ, এখনতো বাজারে আমার কাছে সবাই আইসা জিজ্ঞেস করে কিয়ের রাসেলে (জাহিদ আহ্সান রাসেল) বলে চাল ডাল দেয়। আমি বলি হ কি হইছে তাতে? আপনার কি কেউ আছে নাকি? বাবা হঠাৎ করে চোখের পানি ফেলে বলে আরে এরশাদ নগর তোর জন্ম, এখানে আমি ব্যবসা করি। তোদের কে এই জায়গায় পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করছি, তোরা আমার বংশধর, তোদের কে শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার ভালো বাসতেন এবং ১৯৯৫ সালে আহসান উল্লাহ মাষ্টার আমাকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাব উদ্বোধন কইরা দেয়। আমি আজ ৪৮ বছর ধরে এই এলাকায় থাকি, কোনো দিন আমার নামে কেউ একটা কথা বলতে পারেনাই। অনেক কথা বলার পর দেখি একটা টাকার বান্ডিল বার করতে। টাকার বান্ডিলটা আমার হাতে দিয়ে বলে, এখানে এক লক্ষ টাকা আছে – আমার দশ মাসের মুক্তিযোদ্ধার ভাতা। এই টাকা দিয়ে পঞ্চাশ বস্তা চাউল কিনে আমার এরশাদ নগরের ভাই – বোনদের দিবি। আরো বলেন – আমি একটা কথা শুনছি তুই নাকি আহসান উল্লাহ স্যারের পোলা রাসেলের (জাহিদ আহসান রাসেল) রাজনীতি করোছ, তাই আমি দিলাম। যদি কোনদিন তোর নামে উল্টাপাল্টা কিছু শুনি তাহলে আমার বাড়ি থেকে চলে যাবি। আজ অনেক আনন্দ লাগছে, আমি ধন্য একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার বাবার এই দোয়া পেয়ে। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ্ যেন তাকে নেক হায়াত দান করেন, আমিন…।”

এই নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মহান ব্যক্তির নাম হচ্ছে “মোহাম্মদ জীবন মিয়া সরকার”। তিনি ১৯৫০ সালের ১৫ জুন বর্তমান বাংলাদেশের বি-বাড়িয়া জেলার বানছারামপুর থানার ঝুনারকর গ্রামে মোহাম্মদ মালু মিয়া সরকার ও মোসা. রেজের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল দুপুর ১১.৩০ ঘটিকায় মহান এই ব্যক্তির সাথে স্বশরীরে সাক্ষাৎ করে জানতে পারি যে, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম ডাকেই বড় ভাইয়ের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ৩ নং সেক্টরের সিলেট অংশের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। শ্রদ্ধেয় এই সাহসী সৈনিকের নজিরবিহীন অবদানের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হলো যে, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোবাসা ও অঙ্গীকার কতটা দৃঢ় ও নিখাঁদ।

“অহংকার তুমি বাংলাদেশের, শ্রদ্ধেয় মো. জীবন মিয়া সরকার… দেশের প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যয়, প্রমাণ করিলে আরেকবার… একাত্তরে যেমন, ধরেছিলে জীবন বাজি, ছিনিয়ে আনতে বিজয়, বাংলাদেশের…।

করোনা প্রতিরোধে তোমার এই অবদানে, বুঝিয়ে দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ়তা… আমার সোনার বাংলা, লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button