কো ওয়ার্ক

কোওয়ার্ক – ২য় পর্ব

কোওয়ার্ক (CoWork) বা কোওয়ার্কিং (CoWorking) নিয়ে আমার লেখা প্রথম পর্বেই বলেছিলাম, কোওয়ার্ক এর ব্যাপকতা এত বেশি যে সংক্ষিপ্ত লেখার মাধ্যমে যা বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। সারা বিশ্বব্যাপী কোওয়ার্ক এর আওতা ও পরিধি অনেক ব্যাপক এবং বর্তমানে তা খুব দ্রুত গতিতে আরো বেশি বিস্তৃতি লাভ করছে। আর এজন্যই কোওয়ার্ক প্রক্রিয়াটি নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব লিখতে বসে পড়লাম। যেহেতু কোওয়ার্ক এর কোনো আভিধানিক অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি তাই আমি আমার লেখা প্রথম পর্বে কোওয়ার্ক এর শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটা সংজ্ঞা দাঁড় করানোর চেষ্টা করি মাত্র এবং একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্বেও আরেকটি উদাহরণ দিয়ে কোওয়ার্ক এর বিস্তৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আমার এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে, যেটাই করিনা কেন কোওয়ার্কিং এর মাধ্যমে করার চেষ্টা করি। আবার যদি কোনো মুভি বা নাটক দেখি সেখানেও কোওয়ার্ক বিষয়টিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। আমরা সবাই কম বেশি নাটক বা মুভি দেখতে পছন্দ করি, তাই না…? আমিও তার ব্যতিক্রম নই। একটা সময় ছিল যখন আমি তেমন মুভি বা নাটক দেখতাম না বা দেখতে পছন্দ করতাম না। কারণ বেশিরভাগ সময়ই খেলাধূলা, আড্ডা, ভ্রমণ ও নানা সামাজিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু এখন সিংহভাগ সময়ই জীবিকা নির্বাহের কাজে অতিবাহিত হয়ে থাকে। যার ফলে রিফ্রেশমেন্ট বা বিনোদনের কোন সুযোগ থাকে না। তাই দিন শেষে দিন শেষে রিফ্রেশমেন্ট বা বিনোদনের জন্য প্রতিদিন রাতেই কোনো না কোন নাটক বা মুভি দেখা হয়ে থাকে। এরই ভিত্তিতে আজকে আপনাদের সামনে একটা মুভির রেফারেন্স তুলে ধরব যেটাতে আমার কাছে মনে হয়েছে কোওয়ার্ক (CoWork) প্রক্রিয়াটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তবে মুভির রাইটার, প্রডিউসার, পরিচালক, নায়ক, নায়িকা, বা অন্যান্য স্টাফদের মাথায় কোওয়ার্ক বিষয়টি কাজ করেছিল কিনা সেটা আমার জানা নাই। আচ্ছা আপনারা কি ধারণা করতে পারছেন, আমি কোন মুভিটির কথা বলছি…? আমার মনে হয় আপনাদের অধিকাংশের চিন্তায় হয়তো “জন অরণ্য” মুভিটি চলে এসেছে, তাই না…? না আমি সত্তর দশকে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্র “জন অরণ্য” এর কথা বলছি না। আমি বলছি ইন্ডিয়ান কান্নাডা ভাষায় নির্মিত হারি কৃষ্ণা ও পন কুমারানা পরিচালিত ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “Yajamana” চলচ্চিত্রের কথা। চলচ্চিত্রটির প্রডিউসারদ্বয় হলেন শ্যায়লাজ নাগ ও বি. সুরেশ এবং নায়ক চরিত্রে ছিলেন দর্শন (Darshan) ও নায়িকা চরিত্রে ছিলেন রাশমিকা মান্দানা (Rashmika Mandana), সেই সাথে ভিলেন চরিত্রে ছিলেন ঠাকুর অনুপ সিং (Thakur Anoop Sing)। মুভিটিতে Darshan এর অভিনয় করা নায়ক চরিত্রটির নাম ছিল কৃষ্ণা (Krishna), Rashmika Mandana এর অভিনয় করা চরিত্রটির নাম ছিল কাভেরি (Kaveri) ও Thakur Anoop Sing এর অভিনয় করা ভিলেন চরিত্রটির নাম ছিল দেভিসেট্টি (Devishetty)।

আপনারা হয়তো ভাবছেন কোওয়ার্কিং এর উদাহরণ দিতে মুভির রিভিউ করা শুরু করলাম, তাই না…? না আসলে সেরকম কিছু নয়। আলোচনার প্রাসঙ্গিকতার কারণে কিছু তথ্য তুলে ধরতে হলো। যাইহোক যেহেতু মুভির রিভিউ লিখতে বসিনি, তাই আজকে আর মুভির বিষয়ে বিস্তারিত লিখছি না। সুযোগ পেলে অন্য আরেকদিন মুভি নিয়ে লেখার চেষ্টা করব। তবে মুভির কাহিনীর সূত্র ধরেই উদাহরণ দিতে হবে। এবার আসি মূল আলোচনায়।

মুভি অনুসারে ইন্ডিয়ান একটি স্বনামধন্য কোম্পানি হচ্ছে “গোল্ডেন ঈগল কোম্পানি”। যাদের তৈল ইন্ডিয়াব্যাপী ৯৯ ভাগ জায়গাতেই বিক্রয় হত। কিন্তু তারা তা মিডিয়াতে ১০০ ভাগ হিসেবেই প্রচার করত, যা মুভিতে সাংবাদিক চরিত্রে গঙ্গা (Ganga) নামে অভিনয় করা তনয়া হোপ (Tanya Hope) এর কাছে ধরা পড়ে। সাংবাদিক গঙ্গা অন্যান্য মিডিয়ার সামনে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভুল স্বীকার করে সংশোধন করবে বলে জানায়। পরক্ষণেই গোল্ডেন ঈগল কোম্পানির ওনার দেভিসেট্টি বিষয়টি নিয়ে তার কোম্পানির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। আলোচনায় দেভিসেট্টি তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে ঐ ১ ভাগ ক্যাপচার করতে না পারার কারণে কঠোর জবাবদিহি করেন ও গ্রামটিকে চিহ্নিত করেন এবং নিজেই এই বিষয়টি সমাধানের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শতভাগের এক ভাগ ক্যাপচার করতে না পারা গ্রামটি ছিল ইন্ডিয়ার কান্নাডা অঞ্চলের “হলি দূর্গা” গ্রাম।

কোওয়ার্কিং প্রক্রিয়ার একটি জলন্ত উদাহরণ হিসেবে মুভিতে ভারতের কান্নাডা অঞ্চলের হলি দূর্গা গ্রামটি ফুটে উঠেছে। জলন্ত উদাহরণ এই কারণেই বললাম যে, আমার মতে কোওয়ার্কি প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকার কারণেই গোল্ডেন ঈগল এর মত একটা বড় কোম্পানি ছোট্ট হলি দূর্গা গ্রামে তাদের তৈল প্রবেশ করাতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগের সুব্যবস্থা না থাকা ও অধিক দূরত্বের ফলে একজন কৃষক তার পণ্য শহরে গিয়ে বিক্রয় করতে পারে না। আর বিক্রয় করতে পারলেও আবার উপযুক্ত দাম পায় না বা যাতায়াত খরচ সমন্বয় করে পর্যাপ্ত মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয় না। কিন্তু ভারতের কান্নাডা অঞ্চলের হলি দূর্গা গ্রামের কৃষকদের এই দূর্ভোগে পড়তে হতো না। প্রথমত, হলি দূর্গা গ্রামের জনসাধারণ সবাই নিজেদের গ্রামের কৃষকদের হাতে উৎপাদিত তৈল ছাড়া বাহিরের কোনো কোম্পানির তৈল ব্যবহার করতো না এবং দ্বিতীয়ত, তাদের গ্রামের একটি সোসাইটি ছিল যেখানে গ্রামের উৎপাদক, বিক্রেতা, ক্রেতা, কৃষক এক জায়গায় একত্রিত হয়ে নিলামের মাধ্যমে পণ্য ক্রয় – বিক্রয়ের কাজ সম্পন্ন করত। ফলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত দাম পেতো আর ক্রেতা পেতো ন্যায্য মুল্যে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ। ফলে অধিক দূরত্ব অতিক্রম করে ও অতিরিক্ত পরিবহন খরচ দিয়ে কৃষকদেরকে শহরে গিয়ে পণ্য বিক্রয়ের কষ্টটা করতে হয় না। আর এটা সম্ভব হয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা, আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে। এই আস্থা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে উঠার প্রক্রিয়াই হচ্ছে কোওয়ার্ক (CoWork) বা কোওয়ার্কিং (CoWorking)। আমরাও চাইলে আমাদের জায়গা থেকে কোওয়ার্ক প্রক্রিয়াটি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের, পরিবার, সমাজ, জাতি ও দেশের দ্রুত উন্নয়ন সাধন করতে পারি।

এখানেই কিন্তু লেখা ও উদাহরণ শেষ নয়। লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে, তাই এই মুভির দ্বিতীয় অংশ বা দ্বিতীয় উদাহরণটি কোওয়ার্ক নিয়ে আমার লেখা গুলোর তৃতীয় পর্বে তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ্…। তৃতীয় পর্বের উদাহরণটিতে তিনটি বিষয় ফুটে উঠবে – কোওয়ার্কতো থাকবেই সেই সাথে ব্র্যান্ড তৈরি ও গ্রোথ হ্যাকিং এর বিষয়টিও তুলে ধরা হবে।

3 Comments

  1. একটি বহু প্রাচীন ব্যবস্থাকে আবার নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button