কো ওয়ার্ক

কোওয়ার্ক – ১ম পর্ব (কোওয়ার্ক এর সংজ্ঞা)

CoWork (কোওয়ার্ক) মূলত একটি ধারণা বা প্রক্রিয়ার নাম, যে প্রক্রিয়াটি মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করাকে বা একটি স্থানকে ভাগ করে নিয়ে নানাবিধ সুবিধার্থে অনেকজনের কাজ করার বিষয়টিকে বুঝিয়ে থাকে। কিন্তু আমার কাছে CoWork শব্দটির তাৎপর্য ও ব্যাপকতা আরো অনেক বেশি বলে মনে হয়।

CoWork এর কোন আভিধানিক অর্থ খুঁজে না পাওয়া গেলেও শাব্দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই শব্দটির তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। CoWork ইংরেজি দুইটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। যার একটি হলো “Co” এবং আরেকটি হলো “Work”।

“Co” শব্দটি ল্যাটিন ভাষা থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “সহ”। বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী ” Co” একটি সহার্থক উপসর্গ, ইংরেজিতে যাকে Prefix বলা হয়। এই ধরনের শব্দগুলো বাক্য বা Sentence এ স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হতে পারে না। এগুলো অন্য শব্দের আগে বসে। অর্থাৎ উপসর্গ বা Prefix হলো এক বা একাধিক অক্ষর যা অন্য শব্দের পূর্বে যোগ হয়ে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করে এবং শব্দের অর্থের সংকোচন, সম্প্রসারণ ও পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। যেমন – Founder শব্দটির অর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠাতা। এখন এই Founder শব্দের পূর্বে যদি Prefix “Co” যোগ করা করি তাহলে হবে Cofounder যার অর্থ দাঁড়াবে সহ-প্রতিষ্ঠাতা। সম্পূর্ণ নতুন অর্থবোধক একটি শব্দ।

“Work” এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “কাজ”। এটি প্রাচীন ইংরেজি শব্দ “Weorc” থেকে এসেছে। Work শব্দটি বাক্য বা Sentence এ কখনো Noun বা বিশেষ্য পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কখনোবা Verb বা ক্রিয়া পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

সাধারণত কোনো কিছু করাই হলো কাজ, যেমন – ফুটবল খেলা, সাইকেল চালানো, পড়াশোনা করা ইত্যাদি। পদার্থ বিজ্ঞানে কাজের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে যা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী হুবহু তুলে ধরছি – “কোন বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করলে যদি বস্তুর সরণ ঘটে কেবলমাত্র তখনই কাজ করা হয়। কিন্তু বল প্রয়োগ করা সত্ত্বেও যদি বস্তুর সরণ না ঘটে তাহলে কোন কাজ করা হবে না”। পদার্থ বিজ্ঞানের এই সংজ্ঞা অনুসারে যেকোনো কাজেরই একটা ফল থাকতে হবে। যদি কোন কাজের ফল না পাওয়া যায় তাহলে তাকে কাজ বলা যাবে না। তবে আমার মতে যে কোন কাজেরই একটা ফল বিদ্যমান থাকে। এই ফলটি হতে পারে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান অথবা অর্থবহ বা অনর্থক অথবা পরিমাপযোগ্য বা অপরিমাপযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক – ধাক্কা দিয়ে একটি দালান সরানোর কাজ। ভেঙে ফেলা ব্যতীত ধাক্কা দিয়ে একটি দালান সরানো অনেকটা অসম্ভবই বটে। ধাক্কা দেওয়ার ফলে যেহেতু দালানটির সরণ ঘটবে না, তাই পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোন কাজ হিসেবে গণ্য হবে না। যদি ফলাফলের দিক থেকে বিবেচনা করি তাহলে এটিও একটি কাজ, কারণ এই কাজের ফলে অনর্থক শ্রম দিতে হয়েছে এবং সময়ের অপচয় হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ও ধারণা অনুসারে – “একটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য বা ফলাফল অর্জনের নিমিত্তে অবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ শারীরিক ও মানসিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে কাজ বলে।

আমি আমার লেখার শুরুতেই বলেছি যে CoWork হচ্ছে মূলত একটি ধারণা। এমনি CoWorking, CoSpace এই শব্দ গুলোর অর্থ ও সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া গেলেও, CoWork এর কোন আভিধানিক অর্থ ও সংজ্ঞা আমি খুঁজে পাইনি। তাই আমি নিজেই এর শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটা সংজ্ঞা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। CoWork, CoWorking, CoSpace এই শব্দগুলো শুনতে, লিখতে ও পড়তে প্রায় একই রকম। এদের মধ্যে পদগত পার্থক্য থাকলেও অর্থগত ও সংজ্ঞাগত দিক থেকে তেমন কোন পার্থক্য নেই। আর এই শব্দগুলোর সাদৃশ্যতার কারণেই আমরা সিংহভাগ মানুষই এই শব্দগুলোর ক্ষেত্রে প্রায় অভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করে থাকি। তবে CoWork ও CoWorking এই শব্দ দুটির মধ্যে পদগত পার্থক্য ছাড়া অন্য কোন পার্থক্য না থাকলেও CoWork বা CoWorking এবং CoSpace এর মধ্যে অর্থগত ও সংজ্ঞাগত পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। CoWork বা CoWorking বলতে একটি ধারণা বা পুরো একটি প্রক্রিয়াকে বুঝায় অন্যদিকে CoSpace বলতে একটি স্থানকে বুঝিয়ে থাকে যেখানে নানাবিধ সুবিধার্থে কিছু মানুষ একসাথে বা একই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

অতএব পূর্ববর্তী আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, “CoWork হলো এমন একটি ধারণা বা প্রক্রিয়া, যে ধারণা বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার নিমিত্তে ক্রমাগত সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সক্ষম হয়।” CoWork এর অপর একটি অর্থ হতে পারে সমন্বয় করা। কারণ CoWorking এর ফলে পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ – আশিক নামে একজন পুরুষ দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারসমূহ নিয়ে কাজ করেন। অন্যদিকে প্রিয়া নামে একজন মহিলা কসমেটিকস পণ্যসামগ্রী নিয়ে কাজ করেন। বিষয়টা হলো যে, জনাব আশিকের গ্রাহকদের কসমেটিকস পণ্যসামগ্রীর চাহিদা থাকতে পারে অপরদিকে জনাবা প্রিয়ার গ্রাহকদেরও দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারসমূহের চাহিদা থাকাটা স্বাভাবিক। এখন জনাব আশিক ও জনাবা প্রিয়া, দুজন লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সহজ শর্তে সমন্বয়ের ভিত্তিতে একে অপরের পণ্যসামগ্রী নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রয় করতে সম্মত হলে একদিকে যেমন অধিক সংখ্যক গ্রাহকের চাহিদা পূরণ হবে তেমনি নিজেদের ব্যবসায়ের পরিধি ও মুনাফা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। সম্মিলিতভাবে সমন্বয় করে করা এই প্রক্রিয়াটির নামই হচ্ছে CoWork বা CoWorking.

বর্তমান বিশ্বে স্টার্টআপ বা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কোওয়ার্কিং এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক যুগে অল্প পুঁজির স্টার্টআপ গুলোর টিকে থাকার জন্য কোওয়ার্কিং অনস্বীকার্য। এমনকি একটি দেশ বা জাতির দ্রুত উন্নতি সাধনের জন্য কোওয়ার্কের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্র কোওয়ার্কিং এর মাধ্যমেই একটি দেশের শান্তিপূর্ণ পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

বস্তুত CoWork এর ব্যাপকতা এত বেশি, যা আমার এই সংক্ষিপ্ত লেখায় শেষ হবার নয়। চেষ্টা করব পরবর্তীতে অন্য কোন লেখার মাধ্যমে কোওয়ার্কের ইতিহাস, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা গুলো তুলে ধরার। সর্বশেষ দুটি বাংলা প্রবাদ দিয়ে শেষ করব – “দশের লাঠি একের বোঝা” ও “দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ”। এই দুটি প্রবাদের ফলশ্রুতিই হচ্ছে CoWork বা CoWorking.

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button