ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

” নীল সাগরের টানে, সেন্টমার্টিন এর পানে “

সেন্টমার্টিন,টেকনাফ,কক্সবাজার,চট্টগ্রাম,বাংলাদেশ।

সেন্টমার্টিন নামটি মাথায় আসলেই যেন মনের ভেতর থেকে চোখের সামনে ভেসে উঠে জাহাজ ঘিরে সমুদ্রের মাঝে সাদা গাঙচিলের উড়াউড়ি হৃদয় শীতল করা নীল জলরাশির ঢেউ,সারি সারি নারিকেল গাছ , জাউ বোন শৈবাল -প্রবাল, জেলেদের কর্মব্যস্ততা, সমুদ্র তীরে ছোট ছোট বাচ্চাদের দুরন্তপনা, তীরে বাধা নৌকা গুলো আরো কত কি….। যেসব বলে বা লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। আর এ জন্যই অবর্ণনীয় এক মধুর দিধা-দন্দ্বের কারণে সেই ১০ আগস্ট ২০২০ থেকে শুরু করে আজ (৩১ আগস্ট ২০২০) অবধি পর্যন্ত এখনও লেখাই শেষ করে পারিনি। বিষয়টা হচ্ছে শুরু করতে পারলে তো শেষ করতে পারব। আসলে সেন্টমার্টিনের কোন বিষয়টা ছেড়ে কোনটা নিয়ে যে লিখব সেটাই বুঝে উঠতে পারছিনা। যাই হোক তারপরও চেষ্টা করছি সেন্টমার্টিন সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে কিছু লেখার জন্য।

অপরূপ সৌন্দর্যে‍র লীলাভূমি “সেন্টমার্টিন দ্বীপ ” বাংলাদেশের ছোট – বড় সকল বয়সী ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অন‍্যতম একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত টেকনাফ উপজেলার একটি ইউনিয়ন। সেন্টমার্টিন দ্বীপটি বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ডের একেবারে সর্ব দক্ষিণে বঙ্গপসাগরের উত্তর -পূর্ব দিকে অবস্থিত হওয়ার ফলে এর চতুর্দিকে ঘিরে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। পুরো দ্বীপটিই বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি দ্ধারা চারদিক থেকে খুব কোমল মায়ায় বেষ্টিত। তবে নীল জলরাশি পার হয়ে দ্বীপটির উত্তর রয়েছে টেকনাফ উপজেলার মূল ভূ-খন্ডের সবরাং ইউনিয়ন এর শাহ পরীর দ্বীপ এবং পূর্বে রয়েছে মায়ানমারের মূল ভূ-খন্ডের রাখাইন প্রদেশ। দক্ষিণ আর পশ্চিম দিকে তাকালে শুধু দেখা যাবে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি।

নয়নাভিরাম সেন্টমার্টিন দ্বীপটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। ঢাকা হতে সেন্টমার্টিন দূরত্ব প্রায় ৫০০ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম হতে ২২০ কিলোমিটার আর কক্সবাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের এই দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের উত্তর – পূর্বাংশে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মায়ানমারের উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত ( তথ্যসূত্র উইকিপিডিয়া ও গুগল ম‍্যাপ )। সেন্টমার্টিন যেতে হলে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায় এসে যেতে হত। তবে বর্তমানে সেণ্টমার্টিন ভ্রমণকারীদের জন্য ” কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স ” এর পরিচালনায় সরাসরি কক্সবাজার থেকে সেণ্টমার্টিন পর্যন্ত ” কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ” নামে চালু হয়েছে একটি পর্যটকবাহী জাহাজ। প্রায় ৫৫ মিটার দৈর্ঘ‍্য ও ১১ মিটার প্রস্থের এই জাহাজটিতে করে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের জন্য যেতে হবে কক্সবাজারের উত্তর নুনিয়ারছড়ায় বাঁকখালী নদীর কি আই ডব্লিউ টি এ জেটি ঘাঠে। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে জেটি ঘাঠের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। জাহাজটি কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়ায় বাঁকখালী নদীর কি আই ডব্লিউ টি এ জোঠি ঘাঠ থেকে সকাল ৭.০০ টায় ছেড়ে আবার ৩.৩০ এ সেন্টমার্টিন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। কক্সবাজার থেকে সেণ্টমার্টিন পর্যন্ত নৌরুটের দূরুত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে করে এই দূরুত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা। জাহাজটিতে একসাথে ৫৪৭ জন পর্যটক ভ্রমণ করতে পারবে। ” কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ” এর এই সমুদ্র ভ্রমণে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব‍্যবস্থাসহ প্রায় সবধরনের আধুনিক সুযোগ – সুবিধা রাখা হয়েছে। ” কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ” জাহাজটি ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি উদ্বোধন হওয়ার পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে চলাচল শুরু করে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপটি বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় একটি ভ্রমণ কেন্দ্র। ভ্রমণপিপাসুরা চাইলে কক্সবাজার থেকে সরাসরি টেকনাফ নৌরুটে না গিয়ে পূর্বের আলোকে স্থলপথে কক্সবাজার থেকে লোকাল বাস, মাইক্রো বা সি এন জি করে টেকনাফ গিয়ে সেখান থেকে শিপে করে সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন। যা কিছুটা কষ্টদায়ক হলেও খরচ অনেক কম হয় যেখানে কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে করে গেলে খরচ হবে সর্বনিম্ন দুই হাজার টাকা। সেন্টমার্টিন যাওয়ার জন্য টেকনাফ থেকে বর্তমানে কেয়ারী সিন্দবাদ, এমভি ফারহান, গ্রীন লাইন সহ আরো কয়েকটি শিপ রয়েছে। শিপে করে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘন্টা। সেন্টমার্টিন যাওয়ার জন্য টেকনাফ থেকে ট্রলারও চলাচল করে যা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে স্থানীয়রা সাধারণত ট্রলারে করেই যাতায়াত করে। টেকনাফ থেকে শিপে করে সেন্টমার্টিন যেতে চাইলে অবশ্যই সকাল ৯ টার আগেই জাহাজ ঘাটে এসে টিকেট কিনে ফেলতে হবে। কারণ টেকনাফ হতে জাহাজগুলো সকাল ৯.০০ টা থেকে ৯.৩০ এর মধ্যে ছেড়ে দেয় এবং বিকেল ৩.০০ টা থেকে ৩.৩০ এর মধ্যে সেন্টমার্টিন জেটি ঘাট থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। যাইহোক আজকে আর এই বিষয়ে আলোচনা না করে অন্য আরেকটি লেখার মাধ্যমে সেন্টমার্টিন কিভাবে যাওয়া যায়, পরিবহন খরচ কত, থাকা – খাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে বিশদভাবে তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ্।

অপূর্ব সৌন্দর্য্যমণ্ডিত ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য (৩.৭ মাইল) ও ০.৫ কিলোমিটার প্রস্থের (০.৩১ মাইল) সেন্টমার্টিন দ্বীপটির নামকরণের ইতিহাস ও এর সনাক্তকরণের ইতিহাস অনেক পুরাতন। এই দ্বীপটি প্রথম কবে মানুষ সনাক্ত করেছিল সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা কামাল পাশা ও অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন সেন্টমার্টিন নিয়ে নানাভাবে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করেছেন বলে জানা যায়। গবেষক মোস্তফা কামাল পাশা জানান ২৫০ বছর আগে আরব বণিকরা দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য করতে আসলে তখন দ্বীপটি তাদের নজরে আসে। তখন থেকে আরব বণিকরা দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ায় বণিজ্যের উদ্দেশ্য আসা – যাওয়ার পথে দ্বীপটিকে তাদের বিশ্রামের বা বিরতির জায়গা হিসেবে বেছে নেয়। তখন তারা দ্বীপটিকে জাজিরা হিসেবে নামকরণ করেছিল। অধ্যাপক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ ভূ-জরিপ দল দ্বীপটিকে ব্রিটিশ – ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নিলে তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। আর তখন থেকেই দ্বীপটি “সেন্টমার্টিন দ্বীপ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে।

আয়তনে প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার (১৯৭৭ একর) ও উত্তর – দক্ষিণে লম্বা এই দ্বীপটি মূলত নারিকেল প্রধান গাছ প্রধান একটি দ্বীপ। আর তাই অনেক আগে থেকেই সেন্টমার্টিন দ্বীপটি স্থানীয়দের নারিকেল জিঞ্জিরা হিসেবে পরিচিত এবং পরবর্তীতে বাহিরের মানুষ বা পর্যটকদের কাছেও দ্বীপটি নারিকেল জিঞ্জিরা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক ও অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন কথাসাহিত্যিক “হুমায়ুন আহমেদ” এর পরিচালনায় “সেন্টমার্টিন দ্বীপ” নিয়ে “দারুচিনি দ্বীপ” নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবিও নির্মিত হয়। ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হওয়ার পর পর্যটক ও সমুদ্রপ্রেমিদের কাছে “সেন্টমার্টিন” দ্বীপটির জনপ্রিয়তা আরো ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।

সেন্টমার্টিন হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের ইউনিয়ন, যেটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার আওতাধীন ৬ নং ইউনিয়ন পরিষদ।বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এর ওয়েব সাইট থেকে জানা যায় যে, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মোট ১৩ টি পরিবার এই দ্বীপে প্রথম বসতি স্থাপনের জন্য আসে। এরা ছিল মূলত মৎসজীবী। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে দ্বীপটি সময়ের পরিক্রমায় বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৬৭২৯ জন। তবে আমি সর্বশেষ যখন ২০১৯ সালে গিয়েছিলাম তখন যেই হোটেলটাতে ছিলাম, সেটা যিনি পরিচালনা করতেন তিনি আমাদের এক ভ্রমণ সঙ্গীর সম্পর্কে মামা ছিলেন। ওনার কাছ থেকে জানতে পারি সেন্টমার্টিনের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৭৫০০ জন। উত্তর – দক্ষিণে লম্বা এই দ্বীপের দক্ষিণে রয়েছে ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার (উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী) আয়তনের একটি ছোট দ্বীপ। বাংলাদেশের মানচিত্রে সর্বদক্ষিণে চন্দ্রবিন্দুর মত দেখতে এই দ্বীপটি স্থানীয়ভাবে ছেড়া দ্বীপ, ছেড়া দিয়া বা সিরা দিয়া নামে পরিচিত। পর্যটকদের কাছ এটি ছেড়া দ্বীপ নামেই বেশি পরিচিত। সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের আওতাধীন জনশূন্য এই দ্বীপটি মূল দ্বীপের ভূখণ্ড থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন বলেই একে “ছেড়া দ্বীপ” নামে ডাকা হয়। ছেড়া দ্বীপে ভাটার সময় হেঁটে যাওয়া গেলেও জোয়ারের সময় নৌকা দিয়ে যেতে হয়।

বিশ্বরহস্যের এক জীবন্ত পাঠশালা হচ্ছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। রহস্যে ঘেরা দ্বীপটি সৃষ্টিকর্তার অপার সৌন্দর্য্যের এক বিশাল নিদর্শন। দ্বীপটিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল – প্রবাল, বিভিন্ন প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। দ্বীপটির সকালের স্নিগ্ধতা, দুপুরের কড়া – মিষ্টি রোদ, বিকেলের কোমল মায়াবী রোদ, সন্ধ্যা বেলার সূর্যাস্ত, রাতের ঠান্ডা বাতাসের কোমল স্পর্শ ও মধ্য রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে সমুদ্রের গর্জন সবই যেন রহস্যে ঘেরা রিদয় নিংড়ানো সৃষ্টিকর্তার অফুরন্ত সৌন্দর্য্য।

সেন্টমার্টিন এ গিয়ে আপনি কবি না হতে পারলেও সমুদ্রের গর্জন আর বা বাতাসের দোলায় যে কারো অন্তরেই ছন্দের সৃষ্টি হবে। আমার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি…..

আকাশের নীল আর সাগরের নীল,

প্রকৃতির মাঝে আছে এক অপরূপ মিল।

নীল আকাশের সাথে সমুদ্রের নীল জলের মিতালী,

সেন্টমার্টিন হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক লীলাভূমি।

Related Articles

3 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button